সতত, হে নদ তুমি পড় মোর মনে
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।
সতত যেমনি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া যন্ত্র ধ্বনি তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।
বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মেটে কার জলে
দুগ্ধস্রোতরূপি তুমি মাতৃভূমি স্তনে।
আর কি হে হবে দেখা যত দিন যাবে
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে
বারি রূপ কর তুমি এ মিনতি গাবে
বঙ্গজ জনের কানে সখে-সখারিতে।
নাম তার এ প্রবাসে মজি প্রেমভাবে
লইছে যে নাম তব বঙ্গের সঙ্গীতে।

কবি পরিচিতি

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি, যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে — যে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। কলকাতার হিন্দু কলেজে পড়ার সময় ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ জন্মায়, এবং ইংরেজিতে বড় কবি হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ১৮৪৩ সালে তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ১৮৬২ সালে পরিবারসহ ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে পাড়ি জমান, লক্ষ্য ছিল ইংরেজি ভাষায় কাব্য রচনা করে বিশ্বখ্যাতি অর্জন। কিন্তু প্রবাসে থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, মাতৃভাষা ছাড়া প্রকৃত কবিসত্তার পূর্ণতা সম্ভব নয়। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি বাংলা ভাষায় ফিরে আসেন এবং রচনা করেন তাঁর অমর সৃষ্টি মেঘনাদবধ কাব্য। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা: তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য, চতুর্দশপদী কবিতাবলি; নাটক — শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, কৃষ্ণকুমারী; প্রহসন — একেই কি বলে সভ্যতা, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ। বাংলা কাব্যে তিনিই প্রথম প্রবর্তন করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও সনেট (চতুর্দশপদী কবিতা)। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।

সারমর্ম

প্রবাসে থেকে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর জন্মভূমির নদী কপোতাক্ষকে গভীরভাবে স্মরণ করেন। নদীর কলকল ধ্বনি তাঁর কাছে স্বপ্নে শোনা মায়া-মন্ত্রের মতো অনুভূত হয়। বিদেশের বহু নদ-নদী দেখেও তাঁর মন কপোতাক্ষের স্মৃতি ভুলতে পারে না, কারণ এই নদীর জল তাঁর কাছে মায়ের স্তন্যধারার মতোই আপন। কবি জানেন না, তিনি আর কখনো এই নদীর দেখা পাবেন কিনা — তবু আকুল আবেদন জানান, কপোতাক্ষ যেন তাঁর এই ভালোবাসার কথা বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, বন্ধুর মতো তাঁকে মনে রাখে। এই কবিতায় দেশপ্রেম, মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমতা এবং প্রবাসজীবনের বিচ্ছেদ-বেদনা একসাথে প্রকাশ পেয়েছে।

শব্দার্থ

শব্দ অর্থ
সততসর্বদা, সবসময়
বিরলেনির্জনে, একাকী অবস্থায়
মায়া-মন্ত্রধ্বনিস্বপ্নে শোনা জাদুকরি মন্ত্রধ্বনি
কলকলনদীর জলপ্রবাহের শব্দ
জুড়াইতৃপ্ত করি, শান্ত করি
ভ্রান্তির ছলনেভুল/মায়ার বশে
স্নেহের তৃষ্ণামমতা-ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা
দুগ্ধ-স্রোতোরূপীদুধের ধারার মতো (নদীর জলকে মায়ের স্তন্যের সাথে তুলনা)
জন্মভূমি-স্তনেজন্মভূমিরূপ মায়ের বুকে
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে বারি-রূপ করপ্রজা যেমন রাজাকে কর দেয়, তেমনি নদী সাগরকে জলরূপ কর দেয় — এই রূপকের ব্যবহার
মিনতিঅনুরোধ, প্রার্থনা
বঙ্গজ জনের কানেবাংলার মানুষের কানে
সখে, সখা-রীতেবন্ধুর মতো করে
মজি প্রেম-ভাবেপ্রেমের আবেগে মগ্ন হয়ে

চরণ-ভিত্তিক ব্যাখ্যা

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে! / সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে — কবি প্রতিনিয়ত, নির্জনে বসে কপোতাক্ষ নদের কথা স্মরণ করেন। এই স্মরণ কোনো সাময়িক আবেগ নয়, বরং তাঁর মনের সদা-জাগ্রত এক অনুভূতি।

সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে / শোনে মায়া-মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে / জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে — রাতে মানুষ ঘুমের মধ্যে যেমন স্বপ্নে মায়াবী ধ্বনি শোনে, কবিও তেমনি প্রবাসে বিদেশি নদীর জলের শব্দকে কপোতাক্ষের কলকল ধ্বনি বলে ভ্রম করে মনকে সান্ত্বনা দেন। জেনেও এটি সত্যি নয়, তবু এই ভ্রান্তিতেই তিনি তৃপ্তি খোঁজেন।

বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে, / কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে? — কবি বিদেশে অসংখ্য নদী দেখেছেন, কিন্তু কোনো নদীর জলই তাঁর মনের গভীর স্নেহ-তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। জন্মভূমির নদীর জায়গা অন্য কিছু নিতে পারে না।

দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে — কবির কাছে কপোতাক্ষ নদ যেন মাতৃভূমিরূপ মায়ের স্তন্যধারা। এই একটি চরণে কবি জন্মভূমি ও মাতৃস্নেহকে একাকার করে ফেলেছেন — বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত রূপক।

আর কি হে হবে দেখা?—যত দিন যাবে — অষ্টক থেকে ষষ্টকে ভাবের পরিবর্তন ঘটে। কবির মনে সংশয় জাগে — দীর্ঘ প্রবাসজীবনে আদৌ তিনি আর কখনো প্রিয় নদের দেখা পাবেন কিনা।

প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে / বারি-রূপ কর তুমি — প্রজা যেমন রাজাকে কর দেয়, কপোতাক্ষ নদও তেমনি নিজের জলধারা সাগরকে অর্পণ করে চলেছে — একটি রাজকীয় রূপকের মাধ্যমে নদীর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহকে বর্ণনা করা হয়েছে।

এ মিনতি, গাবে / বঙ্গজ জনের কানে, সখে, সখা-রীতে / নাম তার — কবি নদের কাছে বন্ধুর মতো মিনতি জানান — যেন তাঁর এই ভালোবাসার কথা, তাঁর নাম, বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।

এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে / লইছে যে তব নাম বঙ্গের সংগীতে — কবিতার শেষ চরণে কবি জানান, প্রবাসে থেকেও প্রেমের আবেগে বিভোর হয়ে তিনি কপোতাক্ষের নাম বাংলার কাব্য-সংগীতে চিরস্থায়ী করে রেখে যাচ্ছেন — এটাই তাঁর মাতৃভূমির প্রতি চিরন্তন শ্রদ্ধার্ঘ্য।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

১. ‘কপোতাক্ষ নদ’ কোন ধরনের কবিতা?
উত্তর: চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট।

২. কপোতাক্ষ নদের উৎপত্তি কোথায়?
উত্তর: যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলায় ভৈরব নদী থেকে এর উৎপত্তি।

৩. কবি কোন দেশে বসে এই কবিতা রচনা করেন?
উত্তর: ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে বসে।

৪. কবি নদীর জলকে কীসের সাথে তুলনা করেছেন?
উত্তর: মাতৃভূমিরূপ মায়ের স্তন্যধারার (দুগ্ধ-স্রোতের) সাথে।

৫. সনেটের অষ্টক ও ষষ্টক বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: সনেটের প্রথম আট চরণকে অষ্টক এবং শেষ ছয় চরণকে ষষ্টক বলা হয়। অষ্টকে ভাবের প্রবর্তনা এবং ষষ্টকে ভাবের পরিণতি প্রকাশিত হয়।

৬. কবিতায় ‘প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে বারি-রূপ কর’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: প্রজা যেমন রাজাকে কর দেয়, তেমনি নদও তার জলধারা রাজারূপ সাগরকে অর্পণ করে চলেছে — এই রূপকের মাধ্যমে নদীর প্রবাহকে বোঝানো হয়েছে।

৭. কবিতায় কবির মূল আবেগ কী?
উত্তর: প্রবাসে থেকে জন্মভূমি ও তার নদীর প্রতি গভীর স্মৃতিকাতরতা ও দেশপ্রেম।

৮. মাইকেল মধুসূদন দত্তের মহাকাব্যের নাম কী?
উত্তর: মেঘনাদবধ কাব্য।

৯. মাইকেল মধুসূদন দত্ত কত সালে, কোথায় মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন, কলকাতায়।

১০. কবি নদের কাছে শেষ পর্যন্ত কী মিনতি জানিয়েছেন?
উত্তর: তাঁর এই প্রবাসজীবনের ভালোবাসার কথা যেন কপোতাক্ষ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় এবং বন্ধুর মতো তাঁকে স্মরণ করে।

সৃজনশীল-ধর্মী চিন্তার জন্য (উদ্দীপক-ভিত্তিক প্রশ্নের প্রস্তুতি)

নিজের এলাকা/দেশ ছেড়ে দূরে থাকা কেউ যদি তার শৈশবের নদী বা গ্রামের কথা মনে করে কষ্ট পায়, সেই অনুভূতির সাথে এই কবিতার কবির অনুভূতির তুলনা করা যায় — উভয়ক্ষেত্রেই মূল সুর: মাতৃভূমির স্মৃতি ভোলা যায় না, তা যত দূরেই থাকা হোক না কেন।

আলোচনার জন্য মূল ভাবনা: দেশপ্রেম শুধু দেশে থেকে প্রকাশ পায় না — প্রবাসে বসেও মাতৃভূমির প্রতি গভীর মমতা প্রকাশ করা যায়, যেমনটি মধুসূদন দত্ত এই কবিতায় করেছেন।

Leave a Reply